প্রাধান্য পাচ্ছে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য

সাত বছর পর বহির্মুখী বিনিয়োগে বড় উল্লম্ফন চীনের

চীন থেকে বিদেশে বিনিয়োগ ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চে পৌঁছেছে গত বছর।

চীন থেকে বিদেশে বিনিয়োগ ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চে পৌঁছেছে গত বছর। ২০২৪ সালের তুলনায় দেশটির বহির্মুখী বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। কৌশলগত কারণে এ প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে জ্বালানি ও খনিজ খাত। একই সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে সরে এসে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

রোডিয়াম গ্রুপের চায়না ক্রস বর্ডার মনিটর অনুযায়ী, গত বছর চীনের নতুন প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে। অর্থের এ অংক ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ হলেও ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় এখনো অনেক কম।

নিউইয়র্কভিত্তিক স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গত বছর ঘোষিত চীনা বহির্মুখী বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেকই গেছে জ্বালানি খাতে। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রাথমিক কাঁচামাল। এর বিপরীতে ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে অটোমোটিভ খাতে অংশীদারত্ব। এর কারণ হলো বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) উৎপাদন ও এর ঊর্ধ্বমুখী সরবরাহ চেইনে গতি হ্রাস।

এমন সময় চীন থেকে বিদেশে বিনিয়োগের উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে, যখন দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে। একই সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের কারণে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে।

রোডিয়াম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ড্যানিয়েল গোহ বলেন, ‘চলতি বছরও জ্বালানি ও প্রাথমিক কাঁচামাল খাতে চীনের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে। আংশিক কারণ হলো খাতগুলো স্বভাবতই উচ্চমূল্যের ও দীর্ঘমেয়াদি। এ ধরনের পণ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বিনিয়োগ আকর্ষণ করে।’

গত বছর চীনা পুঁজি মূলত এশিয়া ও সাহারা-উত্তর আফ্রিকায় কেন্দ্রীভূত ছিল। এ সময় বড় বিনিয়োগের মধ্যে ছিল গিনির সিমান্দু লৌহ আকরিক খনি ও নাইজেরিয়ায় দুটি বড় লিথিয়াম প্রক্রিয়াকরণ কারখানা। এছাড়া তংকুন গ্রুপ, শিনফেংমিং গ্রুপ ও তিংশান গ্রুপ ইন্দোনেশিয়ায় একটি পরিশোধন ও রাসায়নিক কমপ্লেক্সে ৫৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইনস্টিটিউট এশিয়া ও সাংহাইয়ের গ্রিন ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার পরিচালিত পৃথক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বিদেশী অবকাঠামো খাতে প্রধান অর্থায়ন কর্মসূচি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) গত বছরও উচ্চমাত্রার বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছিল চীন।

ক্রিস্টোফ নেডোপিলের এক গবেষণা অনুসারে, গত বছর চীনের অধিকাংশ বিনিয়োগজুড়ে ছিল ধাতু ও খনি শিল্পের খনিজ প্রক্রিয়াকরণ খাত। এ সময় এককভাবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগগ্রহীতা দেশ কাজাখস্তান, যার আকার প্রায় ২ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। এতে প্রাধান্য পেয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ও তামাসংক্রান্ত প্রকল্প।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাটা সেন্টার পরিচালনায় বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এ কারণে প্রাথমিক কাঁচামাল ও জ্বালানি খাতে আরো বেশি চীনা পুঁজি আকৃষ্ট হচ্ছে। রোডিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, চীনের ভোক্তাপণ্য কোম্পানিগুলোও বিদেশে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রম বেড়েছে। যদিও এখনো চীনের বিদেশী বিনিয়োগ মূলত গ্রিনফিল্ড প্রকল্প, বিশেষ করে উৎপাদন খাতনির্ভর। তা সত্ত্বেও ২০২২ সালের পর থেকে এমঅ্যান্ডএ লেনদেনের মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সাল থেকে এ প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে কমছিল।

চীনা কোম্পানিগুলো আগের কয়েক বছরে পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে গাড়ি উৎপাদন স্থানীয়করণে (স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবেই উৎপাদন) একাধিক ঘোষণা দিয়েছিল। গত বছর প্রায় সব অঞ্চলেই নতুন উৎপাদন কেন্দ্র ঘোষণার সংখ্যা কমেছে, ব্যতিক্রম ছিল উত্তর আফ্রিকা। স্থানীয় উৎপাদনের কিছু উদ্যোগ থাকলেও বিদেশী বাজারে এখনো চীন থেকে রফতানির মাধ্যমেই সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসন খাতে ঋণ কমানোর (ডিলিভারেজিং) ফলে চীনে স্থানীয় মূলধনের প্রাপ্যতা বেড়েছে। এর সুযোগ নিয়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে বড় আকারের উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ এখনো বিদেশী বিনিয়োগের তুলনায় অনেক বেশি।

বহির্মুখী বিনিয়োগের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় চীনা বিনিয়োগ গত বছর রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও ওশেনিয়া মিলিয়ে মোট ঘোষিত বিদেশী বিনিয়োগের অংশ ছিল ২০ শতাংশেরও কম, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশ্চিমা দেশগুলোয় চীনা পুঁজি নিয়ে নজরদারি বেড়েছে। দেশীয় উৎপাদন ও শিল্প খাত রক্ষার জন্য অনেক সরকার বাধা তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশটির বহির্মুখী বিনিয়োগে। জার্মানি এরই মধ্যে চীনের বেশ কয়েকটি অধিগ্রহণ প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছে। সুইজারল্যান্ড কৌশলগত খাতে চীনা বিনিয়োগ যাচাইয়ের জন্য নতুন আইন পাস করেছে।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও কঠোর নজরদারির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ নিয়েও চীনা কোম্পানিগুলো আরো সতর্ক হয়ে উঠেছে। গত বছর উন্নত প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও কৃষিজমিতে চীনা বিনিয়োগের পর্যালোচনা আরো জোরদার করতে কমিটি অন ফরেন ইনভেস্টমেন্ট ইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটকে (সিএফআইইউএস) নির্দেশ দেয় হোয়াইট হাউজ।

আরও